বাসা দেখতে গিয়ে আমরা কী দেখি? আলো-বাতাস, রান্নাঘরের মাপ, ভাড়া। ভবনটা কতটা মজবুত, সেটা প্রায় কেউ জিজ্ঞেসই করি না।

অথচ ঢাকা ঘনবসতিপূর্ণ শহর, আর এখানকার অনেক ভবন নির্মাণের সময় নিয়ম পুরোপুরি মানা হয়নি, এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই করে আসছেন। ভূমিকম্প কবে হবে, কেউ বলতে পারে না। কিন্তু কোন ভবনে থাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত আপনার হাতে।

একটা কথা আগেই বলে রাখি। চোখে দেখে ভবনের পূর্ণ নিরাপত্তা বোঝা যায় না, সেটা প্রকৌশলীর কাজ। তবে কিছু সতর্কসংকেত সাধারণ মানুষও ধরতে পারেন। এই লেখায় সেগুলোই সাজিয়ে দিলাম।

বাসা পছন্দের আগে প্রথম প্রশ্ন: ভবনটা বৈধ তো?

সুন্দর বাসার ছবি দেখার আগে কাগজের খবর নিন। বাড়িওয়ালাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন:

  • ভবনের নকশা কি রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত?

  • অনুমোদিত তলার চেয়ে বেশি তলা কি তোলা হয়েছে?

  • নির্মাণের সময় মাটি পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না?

  • ভবনের কাঠামোগত নকশা কোনো প্রকৌশলী করেছেন কি না?

বাড়িওয়ালা এসব প্রশ্নে বিরক্ত হলে বা এড়িয়ে গেলে সেটাই একটা সংকেত। ভালো ভবনের মালিকেরা সাধারণত এসব কাগজ দেখাতে দ্বিধা করেন না।

নতুন নির্মাণে আরেকটা জিনিস দেখুন। ভবনের গায়ে বা পাশে এখনো কাজ চলছে কি না। অনুমোদনহীন বাড়তি তলা যোগ করার ঘটনা ঢাকায় নতুন নয়।

ভবনের বাইরে থেকে যা দেখবেন

বাসার ভেতরে ঢোকার আগে বাইরে দাঁড়িয়ে একটু সময় নিন। বেশির ভাগ লক্ষণ এখানেই ধরা পড়ে।

১. দেয়ালে ও কলামে ফাটল

সব ফাটল বিপজ্জনক নয়। প্লাস্টারে চুলের মতো সরু দাগ প্রায় সব বাড়িতেই থাকে। কিন্তু এগুলো দেখলে সতর্ক হোন:

  • কলাম বা বিমে ফাটল, বিশেষ করে আড়াআড়ি বা কোনাকুনি ফাটল

  • দেয়ালে কোনাকুনি (X আকৃতির) ফাটল

  • চওড়া ফাটল, যার ভেতরে আঙুলের নখ ঢুকে যায়

  • দরজা-জানালার কোনা থেকে শুরু হওয়া ফাটল

২. বের হয়ে থাকা বা মরিচা-ধরা রড

প্লাস্টার খসে রড দেখা যাচ্ছে? সেই রডে মরিচা? এর মানে ভেতরে পানি ঢুকেছে, আর কংক্রিটের শক্তি কমে যাচ্ছে। ভবন পুরোনো হলে এটা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

৩. নিচতলায় খোলা পার্কিং বা বড় ফাঁকা জায়গা

ঢাকায় অনেক ভবনের নিচতলা গাড়ি রাখার জন্য খোলা, শুধু কয়েকটা কলামের ওপর ওপরের তলাগুলো দাঁড়িয়ে। ভূমিকম্পে এ ধরনের ভবন বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে, কারণ নিচের তলা তুলনামূলক দুর্বল। এমন ভবনে ওঠার আগে একজন প্রকৌশলীর মতামত নেওয়াই ভালো।

৪. ভবন হেলে আছে কি না

একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভবনের কোনা বরাবর তাকান। কোনো দিকে হেলে আছে মনে হলে, কিংবা মেঝে বা বারান্দা ঢালু লাগলে, এড়িয়ে যান।

৫. পাশের ভবনের সঙ্গে দূরত্ব

দুটি ভবন একেবারে গায়ে গায়ে লাগানো থাকলে ভূমিকম্পের কাঁপুনিতে একটা আরেকটাকে ধাক্কা দিতে পারে। মাঝে কিছুটা ফাঁক থাকা ভালো।

৬. আশপাশে মাটি ও নির্মাণকাজ

এলাকাটা কি ভরাট করা জলাভূমি বা নিচু জমি ছিল? প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করলে জানা যায়। ভরাট জমির মাটি ভূমিকম্পে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশে বড় গভীর খনন বা পাইলিংয়ের কাজ চলছে কি না, তাও দেখুন।

ভবনের ভেতরে যা দেখবেন

সিঁড়ি ও বের হওয়ার পথ

সিঁড়িই ভূমিকম্পের সময় আপনার বের হওয়ার পথ। তাই:

  • সিঁড়ি চওড়া ও পরিষ্কার কি না, মালপত্র জমানো নেই তো?

  • সিঁড়ির দেয়ালে বা ধাপে ফাটল আছে কি না

  • দুটি বের হওয়ার পথ আছে কি না, থাকলে ভালো

  • সিঁড়িতে আলো থাকে কি না

ছাদ, বারান্দা ও ঝুলন্ত জিনিস

ছাদ বা বারান্দার কার্নিশে খসে পড়ার মতো ঢিলা অংশ আছে কি না, দেখে নিন। ভূমিকম্পে আহত হওয়ার বড় একটা কারণ ভবন ধসে পড়া নয়, ওপর থেকে জিনিস পড়ে যাওয়া।

গ্যাস লাইন ও বিদ্যুতের সংযোগ

গ্যাসের পাইপ বা সংযোগে লিক বা ঢিলা অংশ আছে কি না, দেখুন। ভূমিকম্পের পর আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। গ্যাসের মূল ভালভ কোথায়, জেনে রাখুন।

এক নজরে: সবুজ সংকেত ও লাল সংকেত

সবুজ সংকেত (ভালো লক্ষণ)

লাল সংকেত (সাবধান)

অনুমোদিত নকশা ও কাগজপত্র দেখাতে বাড়িওয়ালার আপত্তি নেই

কাগজ চাইলে এড়িয়ে যান বা বিরক্ত হন

দেয়াল ও কলাম পরিষ্কার, বড় ফাটল নেই

কলাম বা বিমে ফাটল, কোনাকুনি ফাটল

ভবন সোজা, মেঝে সমতল

হেলে থাকা ভবন বা ঢালু মেঝে

সিঁড়ি চওড়া ও খোলা

সরু সিঁড়ি, জিনিসে ঠাসা

নিচতলা দেয়ালে বা কাঠামোয় শক্ত

নিচতলা কলামের ওপর ফাঁকা (খোলা পার্কিং)

আশপাশে রেসকিউ গাড়ি ঢোকার মতো রাস্তা

গলি এত সরু যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকবে না

লাল সংকেতের একটা-দুটো দেখলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সেই অবস্থায় বাসা চূড়ান্ত করার আগে প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কোন তলায় থাকবেন?

এর সর্বজনীন উত্তর নেই। নিচের তলা থেকে বের হওয়া সহজ, কিন্তু ভবন দুর্বল হলে নিচতলাই সবচেয়ে বেশি চাপে থাকে। উঁচু তলায় কাঁপুনি বেশি অনুভূত হয় আর নামতে সময় লাগে।

তাই তলা বাছার চেয়ে ভবনটা কেমন, সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মজবুত ভবনে যেকোনো তলাই তুলনামূলক নিরাপদ। দুর্বল ভবনে কোনো তলাই নিরাপদ নয়।

সন্দেহ হলে প্রকৌশলীকে দেখান

বাসা পছন্দ হয়েছে কিন্তু মনে খটকা আছে? তাহলে একজন সিভিল বা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারকে একবার ভবনটা দেখিয়ে নিন। পরিচিত কেউ থাকলে ভালো, না থাকলে অল্প ফি দিয়ে পরামর্শ নেওয়া যায়। কয়েক হাজার টাকার এই খরচ আপনার নিরাপত্তার তুলনায় অনেক কম।

বাসায় ওঠার পর যা করবেন

ভবন যেমনই হোক, ঘরের ভেতরের কিছু ব্যবস্থা ঝুঁকি কমায়:

  • ভারী আসবাব দেয়ালের সঙ্গে আটকে দিন। আলমারি, বুকশেলফ, ফ্রিজ নড়ে পড়তে পারে।

  • বিছানার ওপরে বা মাথার কাছে ভারী জিনিস টাঙাবেন না।

  • ঘরে নিরাপদ জায়গা চিনে রাখুন, যেমন শক্ত টেবিলের নিচ।

  • টর্চ, পানি, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স ও জরুরি নম্বর এক জায়গায় রাখুন।

  • জরুরি কাগজপত্রের কপি হাতের কাছে রাখুন।

  • দুজনে (বা পরিবারে) আগেই ঠিক করে রাখুন, বিপদে কে কী করবে আর কোথায় জড়ো হবে।

ভূমিকম্প শুরু হলে কী করবেন

মনে রাখুন তিনটা শব্দ: নিচু হোন, মাথা বাঁচান, শক্ত কিছু ধরুন।

  • মেঝেতে নিচু হয়ে শক্ত টেবিল বা আসবাবের নিচে ঢুকে পড়ুন। না থাকলে দুই হাতে মাথা ও ঘাড় ঢাকুন।

  • জানালা, আয়না ও ঝুলন্ত জিনিস থেকে দূরে থাকুন।

  • লিফট ব্যবহার করবেন না।

  • কাঁপুনি চলার সময় দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করবেন না। কাঁপুনি থামলে শান্তভাবে বের হোন।

  • বাইরে এসে ভবন, বিদ্যুতের তার ও দেয়াল থেকে দূরে খোলা জায়গায় যান।

  • বিপদে সাহায্যের জন্য ৯৯৯ নম্বরে ফোন করুন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ভাড়াটিয়া হিসেবে ভবনের কাগজ দেখতে চাওয়া কি ঠিক?

অবশ্যই ঠিক। আপনি নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রশ্ন করছেন। ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করুন, আর উত্তর গুছিয়ে নোট রাখুন।

ফাটল দেখলেই কি বাসা বাদ দেব?

না। প্লাস্টারের সরু ফাটল সাধারণ। কিন্তু কলাম, বিম বা কোনাকুনি চওড়া ফাটল দেখলে বাসা নেওয়ার আগে প্রকৌশলীকে দেখান।

নতুন ভবন মানেই কি নিরাপদ?

না। নতুন ভবন হলেও নকশা অনুমোদিত ছিল কি না, মান ঠিক রেখে নির্মাণ হয়েছে কি না, সেটা দেখা জরুরি। পুরোনো ভবনও যত্নে থাকলে ভালো থাকতে পারে।

ভূমিকম্প-নিরাপত্তার জন্য কি বাড়িওয়ালাকে কিছু বলার অধিকার ভাড়াটিয়ার আছে?

আপনি অনুরোধ করতে পারেন, যেমন বিপজ্জনক ফাটল মেরামত বা সিঁড়ির আলো ঠিক করা। চুক্তির আগে এগুলো লিখিতভাবে ঠিক করে নেওয়া ভালো।

শেষ কথা

ভূমিকম্পকে আটকানো যায় না। কিন্তু কোন দেয়ালের ভেতরে ঘুমাবেন, সেই বাছাইয়ে আপনার হাত আছে।

বাসা দেখতে গেলে শুধু আলো-বাতাস আর ভাড়ার হিসাব না করে, ভবনের কাগজ, ফাটল, পার্কিং আর সিঁড়িটাও একবার দেখে নিন। কাজটা পাঁচ-দশ মিনিটের, কিন্তু এর দাম অনেক বেশি।

আপনি কি কখনো বাসা নেওয়ার আগে ভবনের নিরাপত্তা যাচাই করেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা কমেন্টে জানান।

Comments