বিয়ের পর প্রথম বাসা। শুধু ইট-কাঠের ঘর নয়, দুজনের নতুন জীবনের প্রথম ঠিকানা।
এই আনন্দের মাঝেই কিছু বাস্তব হিসাব থাকে। ভাড়া কত? অগ্রিম কত লাগবে? চুলা আগে কিনব, না খাট? শুরুতে এগুলো গুছিয়ে না নিলে বাড়তি খরচ আর ঝামেলা পিছু ছাড়ে না।
আপনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ বা ছোট কোনো জেলা শহর, যেখানেই সংসার পাতুন, মূল হিসাবগুলো প্রায় একই। শুধু ভাড়ার অঙ্ক আর কিছু স্থানীয় সমস্যা বদলায়।
চলুন ধাপে ধাপে দেখি বাসা নেওয়ার আগে কী যাচাই করবেন, কত টাকা হাতে রাখবেন, আর নতুন সংসারের জন্য কোন জিনিস আগে লাগবে।
সুন্দর ঘর দেখে প্রেমে পড়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জেনে নিন, বাসাটা আপনাদের রোজকার জীবন আর বাজেটের সঙ্গে মানাবে কি না।
কম ভাড়ার বাসা অনেক সময় অফিস থেকে অনেক দূরে হয়। তখন যাতায়াতের খরচ আর সময়, দুটোই বেড়ে যায়। বাসা ভাড়ায় যা বাঁচল, রিকশা, সিএনজি বা বাস ভাড়ায় তা চলে যেতে পারে।
বাসা দেখতে গেলে এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:
অফিসে যাওয়ার সহজ রাস্তা আছে কি না। সম্ভব হলে অফিস টাইমে একবার গিয়ে দেখুন।
কাছে বাজার, ফার্মেসি ও হাসপাতাল আছে কি না।
রাতে ফিরতে নিরাপদ ও আলোকিত কি না।
আশপাশে নির্মাণকাজ বা অতিরিক্ত শব্দ আছে কি না।
বর্ষায় জলাবদ্ধতা হয় কি না। প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করলেই জানা যায়। উপকূলীয় বা নিচু এলাকায় এটা বিশেষভাবে দেখুন।
ছবি আর ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। নিজে গিয়ে ঘুরে দেখুন, সম্ভব হলে দিনের আলোয়।
পানি: কল খুলে চাপ দেখুন। সরবরাহ নিয়মিত কি না, জিজ্ঞেস করুন। পানি কি WASA বা পৌরসভার লাইনের, নাকি নিজস্ব পাম্পের, তাও জেনে নিন।
বিদ্যুৎ: সুইচ, সকেট, ফ্যান ও লাইট কাজ করছে কি না, একে একে পরীক্ষা করুন।
আলো-বাতাস: শোবার ঘরে সকালের আলো ঢোকে কি না দেখুন।
দরজা-জানালা ও তালা: মজবুত কি না দেখুন।
মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট: ঘরের ভেতরে সিগন্যাল কেমন, চেক করুন। কোন ব্রডব্যান্ড কোম্পানি ওই এলাকায় সংযোগ দেয়, তাও জেনে নিন।
গ্যাস: পাইপলাইনের সংযোগ আছে কি না জেনে নিন। অনেক শহরে নেই, তখন সিলিন্ডার লাগবে।
দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব, ছত্রাকের দাগ বা ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ার চিহ্ন দেখলে ওঠার আগেই বাড়িওয়ালাকে জানান। সমাধানের কথা মুখে না বলে সম্ভব হলে লিখিত নিন।
অনেকে মাসিক ভাড়াটাই হিসাব করেন। কিন্তু বাসায় ওঠার প্রথম মাসে খরচ হয় সবচেয়ে বেশি।
খরচের খাত | কেন লাগবে |
|---|---|
প্রথম মাসের ভাড়া | সাধারণত ওঠার আগেই দিতে হয় |
অগ্রিম বা জামানত | বাড়িওয়ালা ও শহরভেদে ভিন্ন, অনেক জায়গায় দুই-তিন মাসের ভাড়া চাওয়ার চল আছে |
স্থানান্তর খরচ | পিকআপ বা ট্রাক ভাড়া, লোকজনের মজুরি |
আসবাব ও গৃহস্থালি সামগ্রী | বিছানা, চুলা, হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদি |
প্রথম বাজার | চাল-ডাল, তেল, মসলা, সবজি |
ইন্টারনেট সংযোগ | সংযোগ ফি ও রাউটার |
জরুরি তহবিল | হঠাৎ কোনো সমস্যায় কাজে লাগবে |
হাতে এই টাকাগুলো ধরে নিয়ে তবেই বাসা চূড়ান্ত করুন।
মুখের কথায় ভরসা না করে এই বিষয়গুলো লিখিত চুক্তিতে রাখুন:
মাসিক ভাড়া কত এবং কোন তারিখের মধ্যে দিতে হবে
বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও সার্ভিস চার্জ কে দেবে
ছোটখাটো মেরামত কার দায়িত্ব
বাসা ছাড়তে কত দিন আগে নোটিশ দিতে হবে
অগ্রিম টাকা কীভাবে ফেরত পাবেন
টাকা দেওয়ার প্রতিবার রসিদ বা অন্তত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের স্ক্রিনশট রেখে দিন। পরে এটাই আপনার প্রমাণ।
একসঙ্গে সব কিনতে যাবেন না। প্রথম মাসে যা না হলেই নয়, শুধু সেটুকু। বাকিটা ধীরে ধীরে, পছন্দ করে।
খাট বা ভালো মানের ম্যাট্রেস, বাজেট কম হলে মেঝেতে ম্যাট্রেস দিয়েও শুরু করা যায়
বালিশ, চাদর, কাঁথা বা কম্বল
কাপড় রাখার আলমারি বা র্যাক এবং হ্যাঙ্গার
জানালার পর্দা
জুতার র্যাক
কাপড় শুকানোর স্ট্যান্ড
ময়লা ফেলার ঝুড়ি
আরামে ঘুমানোটা বাজেটের তালিকায় কাটছাঁট করার জিনিস নয়। দিনের শেষে আপনারা ফিরবেন এই বিছানাতেই।
সোফা বা বসার ব্যবস্থা
ছোট সেন্টার টেবিল
কাজ বা পড়ার টেবিল ও চেয়ার
সাজসজ্জার জিনিস, টিভি
বাসা ছোট হলে ফাঁকা জায়গাকেই আসবাব ভাবুন। কম জিনিস মানে চলাচল সহজ, ঝাড়ামোছাও সহজ।
নিয়মিত বাইরে খাওয়ার চেয়ে ঘরে রান্না করলে খরচ বেশ কমে। তাই রান্নাঘরে কিছু মৌলিক জিনিস রাখুন।
চুলা, বাসায় পাইপের গ্যাস না থাকলে সঙ্গে সিলিন্ডার
হাঁড়ি-পাতিল ও একটি ফ্রাইপ্যান
খুন্তি, হাতা ও রান্নার চামচ
ছুরি ও কাটিং বোর্ড
সবজি ধোয়ার ঝুড়ি
চাল, ডাল ও মসলা রাখার কৌটা
ঢাকনাওয়ালা বক্স
চুলা কেনার আগে জেনে নিন, বাসায় কোন জ্বালানি চলবে। ইলেকট্রিক চুলা নিলে সকেট আর লোড সহ্য করতে পারবে কি না, দেখে নিন।
প্লেট, বাটি, গ্লাস, চামচ, পানির জগ, আর থালাবাসন ধোয়ার সাবান ও স্পঞ্জ। প্রথমে দুজনের জন্য দুই-তিন সেট থাকলেই চলে। অতিথি এলে পরে বাড়িয়ে নেবেন।
প্রথম দিনেই মাসের বাজার করে ফেলবেন না। এক সপ্তাহের মেনু ঠিক করে সেই হিসেবে কিনুন।
চাল, ডাল, আটা
তেল, লবণ, চিনি, প্রয়োজনীয় মসলা
পেঁয়াজ, রসুন, আদা, আলু ও মৌসুমি সবজি
ডিম এবং মাছ বা মাংস
চা-নাশতার উপকরণ
এতে খাবার নষ্ট হয় না, আর "কী কিনেছিলাম, কেন কিনেছিলাম" ধরনের আফসোসও থাকে না।
বাসায় ওঠার প্রথম দিনেই এগুলো লাগবে, তাই আগে থেকে কিনে রাখুন:
বালতি ও মগ
তোয়ালে, সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট-ব্রাশ
টয়লেট ব্রাশ ও ফ্লোর ক্লিনার
মপ, ঝাড়ু ও ডাস্টপ্যান
কাপড় ধোয়ার ডিটারজেন্ট ও কাপড় রাখার ঝুড়ি
টিস্যু ও ময়লার ব্যাগ
ওঠার আগে বাথরুম একবার ভালো করে ধুয়ে নিন। কল, ফ্লাশ আর ড্রেন ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিজে পরীক্ষা করুন।
ছোট জিনিসগুলো চোখে পড়ে না, কিন্তু না থাকলে সবচেয়ে বেশি ভোগায়।
মোবাইল চার্জার ও মানসম্মত মাল্টিপ্লাগ
ইন্টারনেট রাউটার
টর্চলাইট বা চার্জার লাইট, লোডশেডিং বা হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার জন্য
ব্যাটারি ও দেয়ালঘড়ি
প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স: ব্যান্ডেজ, গজ, জীবাণুনাশক, থার্মোমিটার ও জ্বর-ব্যথার সাধারণ ওষুধ
মাল্টিপ্লাগে একসঙ্গে ফ্রিজ, ইস্ত্রি বা হিটারের মতো বেশি বিদ্যুৎ খাওয়া যন্ত্র লাগাবেন না। বৈদ্যুতিক সংযোগে কোনো গোলমাল টের পেলে নিজে মেরামতে না গিয়ে ইলেকট্রিশিয়ান ডাকুন।
দুজনেই কর্মজীবী হলে বাসা প্রায় সারা দিন ফাঁকা থাকে। তাই প্রথম সপ্তাহেই এই কাজগুলো সেরে ফেলুন:
দরজা-জানালার তালা পরীক্ষা করুন, দরকার হলে নতুন ও মজবুত তালা লাগান
বাড়িওয়ালা ও কেয়ারটেকারের নম্বর ফোনে সেভ করুন
কাছের হাসপাতাল ও ফার্মেসির ঠিকানা জেনে রাখুন
জরুরি নম্বরগুলো কাগজে লিখে দেয়ালে বা ফ্রিজে লাগিয়ে রাখুন
জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, চুক্তিপত্র ও রসিদ এক জায়গায় রাখুন
আর একটা কথা। বাসার চাবি কার কাছে থাকবে এবং জরুরি অবস্থায় কে কাকে কীভাবে পাবে, তা আগেই ঠিক করে নিন। ছোট বিষয়, কিন্তু বিপদে এটাই কাজে আসে।
বাজেট নিয়ে বসার সময়টা আসলে দুজনের কথা বলার সুযোগ। কার আয় কত, কার কী প্রয়োজন, কোথায় কমানো যায়, সব খোলাখুলি আলোচনা করুন।
নিচের হিসাবটি শুধু একটি উদাহরণ। বড় শহরে ভাড়া ও যাতায়াত খরচ বেশি হয়, ছোট শহরে তুলনামূলক কম। আপনার এলাকা ও জীবনযাপন অনুযায়ী অঙ্কগুলো বদলে নিন।
খরচের খাত | আনুমানিক মাসিক খরচ |
|---|---|
বাসাভাড়া | ৮,০০০ টাকা |
খাবার ও বাজার | ৬,০০০ টাকা |
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি | ১,২০০ টাকা |
ইন্টারনেট ও মোবাইল | ৮০০ টাকা |
যাতায়াত | ২,০০০ টাকা |
ব্যক্তিগত ও গৃহস্থালি খরচ | ১,৫০০ টাকা |
জরুরি তহবিল ও সঞ্চয় | ১,৫০০ টাকা |
মোট | ২১,০০০ টাকা |
লক্ষ্য করুন, এতে অগ্রিম ভাড়া, আসবাব কেনা ও স্থানান্তরের খরচ ধরা নেই। ওগুলো একবারের খরচ, আলাদা করে হিসাব করতে হবে।
একটা সহজ নিয়ম: মাসের প্রথম দিনেই ভাড়া, বিল ও সঞ্চয়ের টাকা আলাদা করে ফেলুন। বাকিটা দিয়ে মাস চালান।
প্রিন্ট করে ফ্রিজে লাগিয়ে রাখতে পারেন।
ভাড়া ও অগ্রিমের পরিমাণ নিশ্চিত
পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবস্থা যাচাই
দরজা, জানালা ও তালা পরীক্ষা
অফিস, বাজার ও গণপরিবহনের দূরত্ব বিবেচনা
শর্তগুলো লিখিত চুক্তিতে নেওয়া
বিছানা ও বিছানাপত্র প্রস্তুত
রান্নার সরঞ্জাম ও প্রথম সপ্তাহের বাজার
পরিষ্কারের সামগ্রী কেনা
ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা ঠিক করা
বাসা একবার ধুয়ে-মুছে নেওয়া
জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা
বিল দেওয়ার তারিখ লিখে রাখা
জরুরি তহবিলের টাকা আলাদা করা
ঘরের কাজ দুজনে ভাগ করে নেওয়া
এক শোবার ঘর, একটি রান্নাঘর ও বাথরুমের ছোট বাসাই শুরুর জন্য যথেষ্ট। বাজেট, কাজের ধরন (বাসা থেকে কাজ করলে আলাদা জায়গা লাগতে পারে) আর কয়েক বছরের পরিকল্পনা মাথায় রেখে ঠিক করুন।
শহর, এলাকা, ফ্লোর ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী ভাড়া অনেক বদলায়। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে ছোট এক রুমের জন্য সাধারণত বেশি ধরতে হয়, জেলা শহরে তুলনামূলক কম। নির্দিষ্ট এলাকার সাম্প্রতিক ভাড়া পরিচিতজন, প্রতিবেশী বা THE TOLET ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করে নিন।
প্রথম মাসের ভাড়া, অগ্রিম, স্থানান্তর খরচ, প্রয়োজনীয় আসবাব আর প্রথম সপ্তাহের বাজারের টাকা। এর বাইরে কিছু জরুরি তহবিল রাখলে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।
ঘরে রান্না করুন, সপ্তাহের মেনু ঠিক করে বাজার করুন, আর কেনাকাটায় "দরকার" আর "শখ" আলাদা রাখুন। সবচেয়ে কাজের উপায়, মাসে অন্তত একবার দুজনে বসে খরচের হিসাব মেলানো।
প্রথম বাসা কখনোই নিখুঁত হয় না। আর হওয়ার দরকারও নেই।
দরকারি জিনিস দিয়ে শুরু করুন, খরচের হিসাব রাখুন, আর ধীরে ধীরে ঘরটাকে নিজেদের করে নিন। একসময় দেখবেন, ওই ছোট বাসাটাই সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হয়ে আছে।
আপনাদের প্রথম বাসার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? কমেন্টে জানান, কোন জিনিসটা আগে কিনলে ভালো হতো। পরের কোনো দম্পতির কাজে লাগতে পারে।