অনেকেই মনে করেন, মানুষ ভালো হলেই রুমমেট হিসেবে উপযুক্ত। বাস্তবে বিষয়টি একটু ভিন্ন নয় কী?

নতুন বাসা খোঁজার সময় আমরা সাধারণত যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই, সেগুলো হলো ভাড়া, লোকেশন, যাতায়াত ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, গ্যাস-পানি কিংবা রুমের আকার। কিন্তু একটি বিষয় অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায়- রুমমেট কেমন হবে?

বিশেষ করে ব্যাচেলর, চাকরিজীবী কিংবা শিক্ষার্থীদের জন্য রুমমেট নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ আপনি শুধু একটি রুম শেয়ার করছেন না, বরং আপনার ব্যক্তিগত সময়, ব্যক্তিগত জায়গা এবং দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় অংশ অন্য একজন মানুষের সাথে ভাগ করে নিচ্ছেন। তাই বাসা যতই সুন্দর হোক না কেন, রুমমেটের সাথে যদি বোঝাপড়া না থাকে, তাহলে সেই বাসায় স্বস্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

কেন রুমমেট গুরুত্বপূর্ণ?

ধরুন, আপনি পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন, কিন্তু আপনার রুমমেট ঘর অগোছালো রাখতে অভ্যস্ত। অথবা আপনি রাত ১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন, কিন্তু তিনি প্রায় প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে কথা বলেন বা গান শোনেন। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ছোট বিষয়ও ধীরে ধীরে বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাসা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু রুমমেটের জীবনযাত্রা, অভ্যাস বা আচরণের কারণে বাসা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। তাই নতুন বাসায় ওঠার আগে রুমমেট সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোন বিষয়গুলো আগে থেকেই জেনে নেওয়া উচিত?

১. জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন রুটিন

প্রথমেই জানার চেষ্টা করুন তিনি কী করেন। চাকরি করেন, ব্যবসা করেন নাকি শিক্ষার্থী?

কারণ একজন মানুষের রুটিন তার জীবনযাত্রার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কেউ খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠেন, আবার কেউ গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন। দুইজনের জীবনধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন হলে একসাথে থাকতে গিয়ে অসুবিধা তৈরি হতে পারে।

২. পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে মনোভাব

একটি বাসায় একসাথে থাকার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রান্নাঘর ব্যবহার করার পর পরিষ্কার রাখা, বাথরুম ব্যবহারের নিয়ম, আবর্জনা ফেলা কিংবা রুম গুছিয়ে রাখার অভ্যাস -এসব বিষয়ে দুজনের চিন্তাধারা কাছাকাছি হলে একসাথে থাকা অনেক সহজ হয়।

৩. খরচ ও বিল পরিশোধের দায়িত্ববোধ

রুমমেট নির্বাচনের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনৈতিক দায়িত্ববোধ।

বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, ইন্টারনেট বিল কিংবা অন্যান্য খরচ সময়মতো পরিশোধ করেন কি না, সে বিষয়ে ধারণা নেওয়া ভালো। কারণ একজনের অনিয়মিত আচরণের প্রভাব পুরো বাসার উপর পড়তে পারে।

৪. অতিথি আনার অভ্যাস

অনেকের বাসায় প্রায়ই বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজন আসেন। আবার কেউ ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেন।

এ বিষয়ে আগে থেকেই আলোচনা করে নেওয়া ভালো। এতে ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা কমে যায়।

৫. ব্যক্তিত্ব ও আচরণ

রুমমেটের চরিত্র বা ব্যক্তিত্বও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি কি সহজে কথা বলেন? সমস্যা হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চান? নাকি ছোটখাটো বিষয়েও বিরক্ত হয়ে যান? একসাথে বসবাসের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান ও যোগাযোগের মানসিকতা সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি।

শুধু ভালো মানুষ হলেই কি যথেষ্ট?

অনেকেই মনে করেন, মানুষ ভালো হলেই রুমমেট হিসেবে উপযুক্ত। বাস্তবে বিষয়টি একটু ভিন্ন।

একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালো হতে পারেন, কিন্তু তার জীবনধারা আপনার সাথে নাও মিলতে পারে। তাই শুধু ভালো মানুষ খোঁজার পরিবর্তে এমন কাউকে খুঁজে নেওয়া উচিত যার অভ্যাস, রুটিন এবং জীবনযাত্রা আপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কথা বলুন

অনেক সময় মানুষ শুধু ভাড়া কম বা লোকেশন ভালো হওয়ার কারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। কিন্তু কয়েক মিনিট সময় নিয়ে সম্ভাব্য রুমমেটের সাথে কথা বললে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। তার কাজ, রুটিন, বাসা ব্যবহারের নিয়ম, অতিথি আনার বিষয়, খরচ ভাগাভাগি- এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করলে ভবিষ্যতের অনেক সমস্যা আগেই এড়ানো সম্ভব।

শেষ কথা

একটি বাসা শুধু চারটি দেয়াল আর একটি ছাদ নয়। সেখানে আপনার প্রতিদিনের জীবন কাটবে, বিশ্রাম হবে, কাজ হবে এবং ব্যক্তিগত সময় কাটবে। তাই বাসা নির্বাচন করার সময় শুধু রুম, ভাড়া বা লোকেশন নয়, রুমমেট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দিন।

কারণ সত্যি বলতে-

বাসা ভালো হলেই সবকিছু ভালো হয় না। অনেক সময় একটি ভালো রুমমেটই একটি সাধারণ বাসাকে উপভোগ্য করে তোলে, আর একটি ভুল রুমমেট সুন্দর বাসাকেও অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।

Comments