রেজাল্টের উত্তেজনা কমতে না কমতেই শুরু হয় নতুন হিসাব। কোন শহরে ভর্তি হবেন? কোথায় থাকবেন? বাড়ি ছাড়ার পর কে আপনাকে সকালে ডেকে তুলবে?
এই প্রশ্নগুলো ভয় ধরায়, আবার একটু রোমাঞ্চও জাগায়।
বাড়ির বাইরে প্রথমবার থাকা প্রায় সবার জন্যই কঠিন। আপনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট বা অন্য যেকোনো শহরেই যান, শুরুর অনুভূতিগুলো অনেকটা এক। এই লেখায় সেগুলো সামলানোর বাস্তব উপায় পাবেন।
যাওয়ার আগে: মানসিক প্রস্তুতি
প্রথমেই একটা সত্য মেনে নিন। প্রথম কয়েক সপ্তাহ কঠিন লাগবেই। এতে আপনার কোনো দোষ নেই।
মন খারাপ, বাড়ির খাবারের জন্য হাহাকার, রাতে ঘুম না আসা, সব স্বাভাবিক। একে বলে হোমসিকনেস, আর বেশির ভাগ মানুষের এটা সময়ের সঙ্গে কমে যায়।
নিজেকে কয়েকটা কথা বলে রাখুন:
সবকিছু প্রথম দিনেই গুছিয়ে ফেলতে হবে না
ভুল হবে, আর ভুল থেকেই শেখা হবে
সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়
থাকার ব্যবস্থা: সিদ্ধান্তটা তাড়াহুড়োয় নেবেন না
ভর্তির পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোথায় থাকবেন। সাধারণত চারটি পথ থাকে:
থাকার ধরন | সুবিধা | অসুবিধা |
|---|---|---|
হল বা হোস্টেল (প্রতিষ্ঠানের) | খরচ কম, সহপাঠী কাছে | সিট পেতে সময় লাগতে পারে, সবসময় সিট নাও মিলতে পারে |
মেস | তুলনামূলক সাশ্রয়ী, খাবারের ব্যবস্থা থাকে | পরিবেশ ও খাবারের মান মেসভেদে আলাদা |
বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করা বাসা | স্বাধীনতা, আরাম | ভাড়া ও কাজ ভাগাভাগিতে মতের অমিল হতে পারে |
আত্মীয়ের বাসা | নিরাপদ, বাড়ির মতো পরিবেশ | স্বাধীনতা কম, দূরত্ব বেশি হতে পারে |
মেস বা হোস্টেল দেখার সময়
সিদ্ধান্তের আগে নিজে গিয়ে দেখুন। ছবি বা ফোনের কথায় ভরসা করবেন না।
নিরাপত্তা: গেটে তালা আছে কি না, রাতে ফেরার সময় কোনো বাধা আছে কি না
পানি ও বিদ্যুৎ: নিয়মিত কি না
বাথরুম: কতজনে একটা ব্যবহার করে
খাবার: রান্না কেমন, সময়মতো পাওয়া যায় কি না
পড়ার পরিবেশ: রাতে খুব হইচই হয় কি না
ভাড়া ও চুক্তি: কী কী ধরা আছে, অগ্রিম কত, ছাড়ার নিয়ম কী
সম্ভব হলে সেখানে থাকা কোনো সিনিয়র বা ছাত্রের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ব্রোশিওরের চেয়ে অনেক খাঁটি।
খরচ: বাড়ি থেকে টাকা আসবে, কিন্তু হিসাব রাখবে কে?
প্রথমবার হাতে মাসের পুরো টাকা এলে অনেকেই প্রথম দুই সপ্তাহে অর্ধেক শেষ করে ফেলেন। এটা খুবই সাধারণ ভুল।
একটা সহজ কাঠামো ধরতে পারেন। অঙ্কগুলো আপনার শহর ও জীবনযাপন অনুযায়ী বদলে নিন:
খরচের খাত | কী কী ধরবেন |
|---|---|
থাকা | হল, মেস বা বাসার ভাড়া |
খাবার | মেসের খরচ, বাইরের নাশতা, চা |
পড়াশোনা | বই, ফটোকপি, কোচিং বা কোর্স ফি |
যাতায়াত | রিকশা, বাস, বাড়ি যাওয়ার ভাড়া |
ব্যক্তিগত | মোবাইল ডেটা, সাবান-শ্যাম্পু, কাপড় ধোয়া |
জরুরি | অসুস্থতা বা হঠাৎ প্রয়োজনের জন্য আলাদা টাকা |
হিসাব রাখার তিনটি সহজ অভ্যাস
মাসের শুরুতেই ভাড়া ও মেসের টাকা আলাদা করে ফেলুন।
ফোনের নোটে বা খাতায় প্রতিদিনের খরচ লিখুন। শুরুতে ঝামেলা লাগবে, কিন্তু এক মাস পর নিজেই অবাক হবেন।
জরুরি টাকাটা একেবারে আলাদা রাখুন। ওটাকে "অতিরিক্ত" ভাববেন না।
হাতে নগদ টাকা, মোবাইল ব্যাংকিং ও কার্ড, যা-ই ব্যবহার করুন, পিন বা পাসওয়ার্ড কাউকে বলবেন না।
খাবার ও স্বাস্থ্য: অবহেলা করলে ভোগান্তি পিছু ছাড়ে না
বাড়িতে মা-বাবা খেয়াল রাখতেন। এখন সেই দায়িত্ব আপনার।
সময়মতো খান। পরীক্ষার চাপ বা ঘুমের অজুহাতে সকালের নাশতা বাদ দেবেন না।
বাইরের খাবার বারবার খেলে পেট খারাপের ঝুঁকি বাড়ে। পানি ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে খান।
ঘুমের একটা রুটিন তৈরি করুন। রাত জেগে মোবাইল চালালে পরদিন ক্লাসে চোখ খোলা রাখাই কঠিন হয়।
হালকা হাঁটা বা ব্যায়াম মন ও শরীর দুটোর জন্যই ভালো।
নিজের কাছে এগুলো রাখুন
সাধারণ জ্বর-ব্যথা-পেট খারাপের জন্য প্রাথমিক ওষুধ (ডাক্তারের পরামর্শমতো)
থার্মোমিটার, ব্যান্ডেজ
বাড়ির নম্বর ও জরুরি যোগাযোগের নম্বর
নিজের রক্তের গ্রুপ লিখে রাখা একটা কাগজ বা ফোনের নোট
অসুস্থ হলে লুকাবেন না। বাড়িতে জানান আর কাছের ডাক্তারের কাছে যান। একা একা সহ্য করলে ছোট সমস্যা বড় হয়ে যায়।
পড়াশোনা: স্কুল-কলেজের মতো চলবে না
বিশ্ববিদ্যালয় বা নতুন প্রতিষ্ঠানে কেউ আপনার পেছনে লেগে থাকবে না। নিজের পড়ার দায়িত্ব নিজেকে নিতে হবে।
কয়েকটা জিনিস প্রথম থেকেই করুন:
ক্লাসে নিয়মিত থাকুন। একবার ফাঁক পড়লে ধরা কঠিন হয়।
ক্লাস রুটিন ও সিলেবাস প্রথম সপ্তাহেই বুঝে নিন।
বুঝতে না পারলে শিক্ষককে প্রশ্ন করুন। লজ্জা পাবেন না।
সহপাঠী বা সিনিয়রদের সঙ্গে স্টাডি গ্রুপ করুন।
পরীক্ষার আগের রাতের জন্য সব না রেখে প্রতিদিন অল্প অল্প পড়ুন।
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গেলে
অনেকে HSC-এর পরে ভর্তি কোচিংয়ের জন্য আলাদা শহরে যান। সেখানে ক্লাস, পড়া আর থাকার ঝামেলা একসঙ্গে সামলাতে হয়। তাই কোচিং বেছে নেওয়ার আগে খোঁজ নিন, সেটা সত্যিই আপনার দরকার কি না, আর আপনার বাজেটের মধ্যে আছে কি না। শুধু অন্যে যাচ্ছে বলে যাবেন না।
নতুন বন্ধু তৈরি: সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে দরকারি
নতুন জায়গায় প্রথমে কাউকে চেনেন না। এই অনুভূতিটা অস্বস্তিকর, কিন্তু সবাই একই অবস্থায় আছে।
শুরুটা ছোট করুন:
ক্লাসে পাশের জনকে নিজের নাম বলে পরিচয় দিন
হল বা মেসের সবার সঙ্গে সৌজন্যতা ধরে রাখুন
কোনো ক্লাব, সংগঠন বা খেলাধুলায় যোগ দিন
একসঙ্গে চা খেতে বা নাশতা করতে ডাকুন
সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে না। এটা ঠিক আছে। দুই-তিনজন ভালো বন্ধু পেলেই পরিবেশটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
বন্ধু বাছাইয়ে একটু সতর্ক থাকুন
নতুন শহরে "সবাই করে, তুমিও করো" ধরনের প্রস্তুাব আসতে পারে। ধূমপান, নেশা, রাতভর আড্ডা বা অনলাইন জুয়ার মতো বিষয়ে না বলতে শিখুন। যারা আপনার "না" মেনে নেয়, তারাই ভালো বন্ধু।
নিরাপত্তা: ছোট সতর্কতা, বড় সুরক্ষা
রাতে একা নির্জন রাস্তায় ফেরা এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে বন্ধুদের সঙ্গে যান।
কোথায় যাচ্ছেন আর কখন ফিরবেন, বিশ্বস্ত কাউকে জানিয়ে রাখুন।
অচেনা কারও কাছে ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা বা টাকা দেবেন না।
চাকরি বা বিনিয়োগের নামে "সহজ আয়ের" প্রস্তাবে সতর্ক থাকুন।
ফোনে বা অনলাইনে ওটিপি, পিন বা পাসওয়ার্ড কাউকে বলবেন না।
জরুরি অবস্থায় ৯৯৯ নম্বরে ফোন করুন।
কোনো ঘটনায় অস্বস্তি বা ভয় পেলে চুপ থাকবেন না। বিশ্বস্ত কাউকে বলুন, যেমন বাড়ির মানুষ, শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ।
মন খারাপ হলে কী করবেন
একা থাকার প্রথম মাসে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা চেপে ধরে, তা হলো একাকিত্ব। রাতে বাড়ির কথা মনে পড়বে, কান্না পাবে। এতে লজ্জার কিছু নেই।
এগুলো সাহায্য করতে পারে:
বাড়িতে নিয়মিত কথা বলুন, তবে বারবার কল করে নিজের মন আরও খারাপ করবেন না। দিনে একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন।
রুটিন ধরে রাখুন। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম, খাওয়া আর পড়া মনকে স্থির রাখে।
বাইরে বের হোন। হাঁটুন, ক্যাম্পাস বা পাড়াটা ঘুরে দেখুন।
ছোট ছোট অর্জন উদযাপন করুন। প্রথম সপ্তাহ টিকে গেলেন, এটাই বড় ব্যাপার।
কিন্তু যদি কয়েক সপ্তাহ পরও একেবারে কিছুই ভালো না লাগে, ঘুম বা খাওয়া অস্বাভাবিকভাবে বদলে যায়, বা নিজেকে নিয়ে খারাপ চিন্তা আসে, তাহলে বিশ্বস্ত কাউকে বলুন। বাড়ির মানুষ, কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের কাউন্সেলর, যার কাছে সহজ লাগে। সাহায্য চাওয়া শক্তির লক্ষণ।
বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ: দূরত্ব বাড়ুক, সম্পর্ক নয়
মা-বাবা আপনার জন্য চিন্তায় থাকবেন, বিশেষ করে প্রথম দিকে। আপনি নিজেও তাঁদের মিস করবেন।
ভিডিও কল বা ফোনের একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন
ভালো-খারাপ দুটো খবরই ভাগ করুন, শুধু "সব ঠিক আছে" বললে তাঁরা আরও দুশ্চিন্তায় পড়েন
টাকার সমস্যা হলে লুকিয়ে না রেখে সময়মতো জানান
ছুটিতে বাড়ি যান, কিন্তু প্রতি সপ্তাহে ছুটে যাওয়া শুরু করলে নতুন জায়গায় শিকড় গজাবে না
যাওয়ার আগে চেকলিস্ট
কাগজপত্র
ভর্তি সংক্রান্ত সব কাগজ ও মূল সনদের কপি
জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের কপি
কয়েকটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি
জরুরি যোগাযোগের নম্বরের তালিকা
জিনিসপত্র
বিছানাপত্র, তোয়ালে, কাপড়চোপড় (আবহাওয়া অনুযায়ী)
তালা-চাবি, মাল্টিপ্লাগ
পানির বোতল ও নিজের থালা-গ্লাস (মেসে থাকলে)
প্রাথমিক ওষুধ ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিস
বই, খাতা, কলম, প্রয়োজনীয় যন্ত্র
পরিকল্পনা
থাকার জায়গা নিশ্চিত
প্রথম মাসের খরচের হিসাব
জরুরি অবস্থায় কাকে ফোন করবেন
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রথমবার বাড়ির বাইরে গেলে মন খারাপ হওয়া কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ, একেবারেই স্বাভাবিক। বেশির ভাগের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে এটা কমে আসে। রুটিন তৈরি, নতুন বন্ধু আর বাড়ির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এতে সাহায্য করে।
হল, মেস নাকি বাসা, কোনটা ভালো?
সবার জন্য এক উত্তর নেই। বাজেট, নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব আর নিজের স্বাচ্ছন্দ্য মিলিয়ে ঠিক করুন। সম্ভব হলে যাওয়ার আগে সরাসরি দেখে নিন।
মাসে কত টাকা লাগতে পারে?
শহর, থাকার ধরন আর জীবনযাপনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। যাওয়ার আগে ওই শহরে থাকা কোনো সিনিয়র বা পরিচিতের কাছ থেকে বাস্তব খরচের ধারণা নিন।
নতুন শহরে পড়াশোনার চাপ সামলাব কীভাবে?
প্রথম সপ্তাহেই রুটিন তৈরি করুন, ক্লাসে নিয়মিত থাকুন আর প্রতিদিন অল্প অল্প পড়ুন। বুঝতে না পারলে শিক্ষক বা সিনিয়রদের জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা করবেন না।
বন্ধু না পেলে কী করব?
ধৈর্য ধরুন। ক্লাব, সংগঠন বা খেলাধুলায় যোগ দিন, আর নিজে থেকে কথা শুরু করুন। সবাই নতুন বন্ধু খুঁজছে, হয়তো ওরাও আপনার মতোই ভয় পাচ্ছে।
শেষ কথা
নতুন শহর প্রথমে অচেনা আর কঠিন লাগবেই। কিন্তু একদিন হঠাৎ খেয়াল করবেন, রাস্তাগুলো চেনা হয়ে গেছে, চায়ের দোকানের মামা আপনার অর্ডার মুখস্থ জানেন, আর ছুটিতে বাড়ি গেলেও এই শহরের জন্য মন কেমন করছে।
নিজের ওপর একটু ধৈর্য রাখুন। প্রতিদিন একটু একটু করে এগোলেই চলবে।
প্রথমবার বাড়ি ছাড়ার অভিজ্ঞতা কেমন? নতুন যারা যাবে, তাদের জন্য একটা পরামর্শ কমেন্টে লিখে যান।