সকালে বাসে ঝুলে অফিস যাওয়া। ফেরার পথে দুই ঘণ্টার জ্যাম। মাস শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখা, বেতনের অর্ধেকই গেছে ভাড়া আর যাতায়াতে।
এমন দিনে মনে হওয়া স্বাভাবিক, "সব ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেলে কেমন হয়?"
প্রশ্নটা ভুল নয়। তবে উত্তরটা সবার জন্য এক নয়। কারও জন্য ঢাকার বাইরে নতুন শুরু মানে স্বস্তি। কারও জন্য মানে আয়ের অনিশ্চয়তা আর একাকিত্ব।
তাই আবেগে ব্যাগ গোছানোর আগে কয়েকটা হিসাব মিলিয়ে নিন। এই লেখা সেই হিসাবগুলোতেই সাহায্য করবে।
"ঢাকা ভালো লাগছে না" একটা অনুভূতি, কারণ নয়। কারণটা নির্দিষ্ট করে বলতে পারলে সিদ্ধান্ত অর্ধেক সহজ হয়ে যায়।
আপনার কারণ কোনটির কাছাকাছি?
যানজট ও ব্যস্ত জীবন থেকে রেহাই
বাসাভাড়া ও খরচ কমানো
মা-বাবা বা পরিবারের কাছে থাকা
নিজের শহরে ব্যবসা শুরু
শান্ত পরিবেশে থাকা
এবার দেখুন, নতুন শহরই কি সমাধান, নাকি ঢাকার ভেতরেই উপায় আছে। ভাড়াই যদি মূল সমস্যা হয়, তাহলে ঢাকারই তুলনামূলক সাশ্রয়ী এলাকায় সরে গেলে কাজ হতে পারে। কিন্তু পরিবারের কাছে থাকাই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে শহর বদলানোই একমাত্র পথ।
আর শুধু বিরক্ত হয়ে চলে গেলে সমস্যাটা সঙ্গে সঙ্গেই যাবে। নতুন শহরেও কিছু না কিছু বিরক্তি থাকবে।
ঢাকার বাইরে অনেক শহরে ভাড়া কম, এটা সত্যি। কিন্তু "ভাড়া কম" মানেই "মোট খরচ কম" নয়।
ধরুন, শহরের একপ্রান্তে সস্তা বাসা পেলেন, অথচ অফিস অন্যপ্রান্তে। রিকশা-সিএনজির খরচে ভাড়ার সাশ্রয় উবে যেতে পারে। আবার শহরের কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ ও আবাসিক এলাকার ভাড়াও এক নয়। তাই ঢাকা আর সম্ভাব্য নতুন শহরের খরচ পাশাপাশি লিখে তুলনা করুন।
খরচ কমলেও আয় কমে গেলে লাভ নেই। তাই সিদ্ধান্তের আগে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজুন:
আপনার পেশার কাজ ওই শহরে আছে কি না
একই কাজে বেতন কেমন, ঢাকার চেয়ে কম হলে কত কম
বর্তমান চাকরি দূর থেকে চালিয়ে যাওয়া যায় কি না
ব্যবসা করলে স্থানীয় বাজারে আপনার পণ্য বা সেবার চাহিদা আছে কি না
নতুন কাজ পেতে মোটামুটি কত সময় লাগতে পারে
ফ্রিল্যান্সার বা রিমোট কর্মীদের জন্য সিদ্ধান্ত সহজ। তবু নিশ্চিত হয়ে নিন, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট ভরসা করার মতো কি না। মিটিংয়ের মাঝখানে নেট চলে গেলে শান্ত পরিবেশের সুবিধা কোনো কাজে আসবে না।
সম্ভব হলে আগে নতুন কাজ ঠিক করুন, তারপর যান। না পারলে অন্তত কয়েক মাসের খরচ চালানোর মতো সঞ্চয় হাতে রাখুন। খালি হাতে নতুন শহরে গিয়ে চাকরি খোঁজা বড় ঝুঁকি।
"ঢাকার বাইরে" বললে একটা শহর বোঝায় না। প্রতিটা শহরের মেজাজ আলাদা।
চট্টগ্রাম: বন্দর ও শিল্পকেন্দ্রিক, ব্যবসা আর কাজের সুযোগ বেশি
রাজশাহী: তুলনামূলক শান্ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত
খুলনা, বগুড়া, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট: প্রতিটিরই নিজস্ব অর্থনীতি ও সামাজিক বৈশিষ্ট্য আছে
কোনো শহরই সবার জন্য সেরা নয়। আপনার পেশার সুযোগ আছে কি না আর দরকারি সুবিধাগুলো মিলছে কি না, সেটাই আসল মাপকাঠি।
শহর বাছাইয়ের সময় এই কয়েকটা জিনিস মিলিয়ে দেখুন:
চাকরি বা ব্যবসার সুযোগ
ভাড়ার পরিমাণ
হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা
বাজার, স্কুল-কলেজ ও গণপরিবহন
পরিবারের কাছাকাছি থাকার সুবিধা
পরিচিত মানুষ বা সামাজিক যোগাযোগ
দীর্ঘমেয়াদে থাকার সম্ভাবনা
একা হলে ঝুঁকি নিজের। কিন্তু সঙ্গে স্ত্রী, সন্তান বা মা-বাবা থাকলে সিদ্ধান্তটা সবার।
স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই কাজ থাকলে দুজনের কর্মসংস্থান দেখতে হবে। সন্তান থাকলে স্কুলে ভর্তি, পড়াশোনার মান আর নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টা ভাবতে হবে। বাড়িতে বয়স্ক কেউ থাকলে চিকিৎসার সুবিধা সবার আগে দেখা দরকার।
একটা কথা মনে রাখুন। পরিবারের সবাই যদি জানে কেন যাচ্ছেন, নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হয়। তাই চূড়ান্ত করার আগে একসঙ্গে বসে সুবিধা-অসুবিধা খোলাখুলি আলোচনা করুন।
নতুন শহরে বাসা নেওয়ার সময় শুধু ভাড়ার দিকে তাকালে ঠকতে পারেন।
বাসা দেখতে গিয়ে খেয়াল করুন:
পানি, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নিয়মিত কি না
বর্ষায় জলাবদ্ধতা হয় কি না
এলাকাটি নিরাপদ কি না
কাছে বাজার, হাসপাতাল ও ফার্মেসি আছে কি না
কর্মস্থলে যেতে কত সময় লাগে
আশপাশে অতিরিক্ত শব্দ বা অন্য ঝামেলা আছে কি না
দিনের বেলা একবার, সন্ধ্যার পর আরেকবার গিয়ে এলাকাটা দেখুন। সন্ধ্যার পরিবেশ অনেক সময় দিনের চেয়ে আলাদা হয়। আর পাড়ার চায়ের দোকানে বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে দুই মিনিট কথা বললে যে তথ্য মেলে, কোনো বিজ্ঞাপনে তা মেলে না।
ঢাকায় বহু বছর থাকলে বন্ধু, সহকর্মী আর প্রতিবেশীদের নিয়ে একটা নিজস্ব জগৎ তৈরি হয়ে যায়। অন্য শহরে গেলে সেটা পেছনে পড়ে থাকবে।
প্রথম দিকে একাকিত্ব লাগতে পারে। এটা অস্বাভাবিক নয়। ছোটখাটো সমস্যা, যেমন ভালো ডাক্তার কোথায় বা গ্যাসের সিলিন্ডার কোথায় পাওয়া যায়, তার সমাধানেও সময় লাগে।
তবে সময়ের সঙ্গে এটা বদলায়। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মেশা, নিজের শখের কাজ চালিয়ে যাওয়া আর কোনো সামাজিক কাজে যুক্ত হওয়া সাহায্য করে।
তাই সিদ্ধান্তের সময় শুধু টাকার হিসাব নয়, মনের স্বস্তিও হিসাবে রাখুন।
নতুন শহরে ভালো হাসপাতাল, চিকিৎসক ও ফার্মেসি আছে কি না, আগেই জেনে নিন। জরুরি অবস্থায় কোথায় যাবেন আর কত সময়ে পৌঁছাবেন, সেটাও জানা থাকা ভালো।
পরিবারে কারও নিয়মিত চিকিৎসা চললে বিষয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য বারবার ঢাকায় আসতে হলে যাতায়াত ও থাকার খরচ আলাদা বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
স্থায়ীভাবে যাওয়ার আগে পছন্দের শহরে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসুন। অন্যের মুখে শুনে নয়, নিজের চোখে দেখুন।
এই সময়ে আপনি:
ভাড়ার আসল দর জেনে নিতে পারবেন
স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখতে পারবেন
কাজ বা ব্যবসার সম্ভাবনা যাচাই করতে পারবেন
যাতায়াতের বাস্তব চিত্র বুঝতে পারবেন
সম্ভব হলে সাময়িক একটা থাকার ব্যবস্থা করে এক-দুই সপ্তাহ দৈনন্দিন জীবনটা চালিয়ে দেখুন। এতে অনুমানের ওপর বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি কমে।
নতুন শহরে সব সময় সবকিছু ছকমতো চলে না। চাকরি পেতে দেরি হতে পারে, ব্যবসায় আয় কম হতে পারে, বাসা বদলাতে হতে পারে।
তাই আগে থেকে ভেবে রাখুন:
অগ্রিম ও স্থানান্তরের টাকা আলাদা রাখুন
কয়েক মাসের জীবনযাত্রার খরচ জমানোর চেষ্টা করুন
নতুন আয় শুরু না হওয়া পর্যন্ত কীভাবে চলবেন, ঠিক করুন
ফিরে আসার খরচ আলাদা রাখুন। দরকার না পড়লেই ভালো, কিন্তু থাকলে মনে জোর পাবেন
আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত মিলিয়ে দেখুন
পরিকল্পনা থাকলে সমস্যা যে হবে না, তা নয়। তবে সমস্যা এলে কী করবেন, সেটা জানা থাকবে।
যাওয়ার মূল কারণ আমার কাছে পরিষ্কার
নতুন শহরে আয়ের সুযোগ যাচাই করেছি
ঢাকা ও নতুন শহরের মাসিক খরচ তুলনা করেছি
থাকার এলাকা ও বাসা সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি
পরিবারের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলেছি
চিকিৎসা ও জরুরি সেবার ব্যবস্থা জেনেছি
প্রাথমিক খরচ ও জরুরি সঞ্চয় তৈরি আছে
নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়ার একটা বাস্তব পরিকল্পনা আছে
সবগুলোয় টিক দিতে না পারলে এখনই যাত্রার সময় নয়। যে ঘরগুলো ফাঁকা, সেগুলো আগে পূরণ করুন।
অনেক ক্ষেত্রে কমে, বিশেষ করে ভাড়া আর কিছু দৈনন্দিন খরচে। কিন্তু শহর, এলাকা আর আপনার জীবনযাপনের ধরনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। তাই সব খরচ পাশাপাশি রেখে হিসাব করুন।
এর কোনো সঠিক উত্তর নেই। যেখানে আপনার আয়ের সুযোগ আছে, খরচ সামর্থ্যের মধ্যে থাকে আর পরিবারের প্রয়োজন মেটে, সেটাই আপনার জন্য সেরা।
সম্ভব হলে আগে নতুন আয়ের ব্যবস্থা করুন। না পারলে পর্যাপ্ত সঞ্চয় আর পরিষ্কার পরিকল্পনা ছাড়া ঝুঁকি নেবেন না।
স্থানান্তরের খরচের সঙ্গে কয়েক মাসের জীবনযাত্রার খরচ। সঠিক অঙ্ক নির্ভর করে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, মাসিক খরচ আর নতুন শহরে আয়ের নিশ্চয়তার ওপর।
এটা মানুষভেদে আলাদা। কেউ কয়েক সপ্তাহে সহজ হয়ে যান, কেউ কয়েক মাস সময় নেন। নতুন মানুষের সঙ্গে মেশা আর নিজের একটা রুটিন তৈরি করা প্রক্রিয়াটা সহজ করে।
ঢাকা ছেড়ে যাওয়া ভালোও নয়, খারাপও নয়। সবকিছু নির্ভর করে আপনার বর্তমান অবস্থা, লক্ষ্য আর বাস্তব সুযোগের ওপর।
নতুন শহরে আয়ের ব্যবস্থা থাকলে, খরচ সামর্থ্যের মধ্যে থাকলে আর পরিবারের জন্য পরিবেশ ঠিক থাকলে, সিদ্ধান্তটা আপনার জীবনে সত্যিই ভালো কিছু আনতে পারে। উল্টো দিকে, শুধু জ্যাম বা অন্যান্য ক্লান্তিতে পরিকল্পনা ছাড়া রওনা দিলে নতুন ঝামেলা অপেক্ষা করতে পারে।
তাই তাড়া নেই। তথ্য যাচাই করুন, হিসাব কষুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
ভালো জীবন কোনো নির্দিষ্ট শহরের নাম নয়। নিজের সামর্থ্য, কাজ আর ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে একটা ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই আসল।
ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে আপনি কোন শহর বেছে নিতেন, আর কেন? কমেন্টে জানান। আপনার অভিজ্ঞতা অন্য কারও সিদ্ধান্তে কাজে লাগতে পারে।