বাসা সুন্দর, ভাড়া ঠিকঠাক সবই মিলেছে কিন্তু আপনার শিশুটি সেখানে কতটা নিরাপদ থাকবে, সেটা কি একবার ভেবে দেখেছেন?

নতুন বাসা খোঁজার সময় সাধারণত ভাড়া, লোকেশন, রুমের সংখ্যা, আলো-বাতাস, পানি ও যাতায়াতের সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে পরিবারে শিশু থাকলে বাসা বাছাইয়ের সময় আরও একটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন- শিশুর নিরাপত্তা।

একটি বাসা বাইরে থেকে যতই সুন্দর বা সুবিধাজনক মনে হোক, সেখানে এমন কিছু জায়গা থাকতে পারে যা ছোট শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বাসা চূড়ান্ত করার আগে কয়েকটি বিষয় ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত।

বারান্দা ও জানালার নিরাপত্তা দেখুন

শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী। তাই নতুন বাসার বারান্দার গ্রিল কতটা নিরাপদ এবং গ্রিলের ফাঁক দিয়ে শিশুর বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না, তা দেখে নিন।

জানালার অবস্থাও ভালোভাবে যাচাই করুন। জানালা খুব সহজে খোলা যায় কি না এবং জানালার পাশে এমন কোনো চেয়ার, টেবিল বা আসবাব আছে কি না, যেটিতে উঠে শিশু সহজেই জানালার কাছে পৌঁছে যেতে পারে এসব বিষয় খেয়াল করা জরুরি।

সিঁড়ি ও লিফট পরীক্ষা করুন

বহুতল ভবনে থাকলে সিঁড়ির নিরাপত্তা বিশেষভাবে দেখা প্রয়োজন। সিঁড়ির রেলিং মজবুত কি না, কোথাও ফাঁকা জায়গা আছে কি না এবং শিশুর সহজে সিঁড়িতে উঠে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।

লিফট থাকলে সেটির দরজা ঠিকভাবে বন্ধ হয় কি না এবং শিশু অসাবধানতাবশত একা লিফটে উঠে যেতে পারে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখুন।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ দেখুন

খোলা বৈদ্যুতিক তার, ক্ষতিগ্রস্ত সুইচ, নিচু অবস্থানে থাকা সকেট কিংবা অন্য কোনো ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা, পাইপ ও রেগুলেটরের অবস্থাও দেখে নিন। কোনো সমস্যা চোখে পড়লে বাসায় ওঠার আগেই বাড়িওয়ালার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন।

বাথরুম ও মেঝের অবস্থা যাচাই করুন

ভেজা বা অতিরিক্ত পিচ্ছিল মেঝেতে শিশু সহজেই পড়ে যেতে পারে। তাই বাথরুমের মেঝে, দরজা এবং পানির ব্যবস্থার পাশাপাশি পুরো বাসার মেঝের অবস্থাও দেখে নিন।

ভাঙা টাইলস, উঁচু-নিচু জায়গা বা এমন কোনো অংশ আছে কি না যেখানে শিশু হোঁচট খেতে পারে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

ভবনের আশপাশের পরিবেশ দেখুন

শিশুর নিরাপত্তা শুধু ফ্ল্যাটের ভেতরের বিষয় নয়। ভবনের আশপাশের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।

বাসার সামনে ব্যস্ত রাস্তা আছে কি না, ভবনের প্রবেশপথ কতটা নিরাপদ, ছাদে ওঠার ব্যবস্থা কেমন এবং আশপাশে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোনো জায়গা রয়েছে কিনা বাসা নেওয়ার আগে এসব বিষয় সম্পর্কে জেনে নিন।

ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানুন

নতুন বাসায় ওঠার আগে বাড়িওয়ালা বা ভবনের দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে পারেন। ভবনে সিসিটিভি, নিরাপত্তাকর্মী বা নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থা থাকলে সেগুলো সম্পর্কে জেনে নিন।

এ ছাড়া জরুরি কোনো পরিস্থিতিতে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, সেটিও আগে থেকে জেনে রাখা ভালো।

বাসা দেখার সময় শিশু নিরাপত্তা চেকলিস্ট

বাসা দেখতে গেলে নিচের বিষয়গুলো একবার মিলিয়ে নিতে পারেন:

  • বারান্দার গ্রিল নিরাপদ কি না

  • জানালা শিশুর নাগালের মধ্যে কি না

  • জানালার পাশে ওঠার মতো আসবাব আছে কি না

  • সিঁড়ির রেলিং ও আশপাশ নিরাপদ কি না

  • লিফটের দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় কি না

  • খোলা বৈদ্যুতিক তার বা ঝুঁকিপূর্ণ সকেট আছে কি না

  • গ্যাসের পাইপ ও সংযোগের অবস্থা ঠিক আছে কি না

  • বাথরুমের মেঝে অতিরিক্ত পিচ্ছিল কি না

  • ঘরের মেঝেতে ভাঙা টাইলস বা ঝুঁকিপূর্ণ অংশ আছে কি না

  • ছাদে যাওয়ার ব্যবস্থা নিরাপদ কি না

  • ভবনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সম্পর্কে জানা হয়েছে কি না

  • ভবনের আশপাশের রাস্তা ও পরিবেশ শিশুর জন্য উপযুক্ত কি না

  • জরুরি প্রয়োজনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে তা জানা আছে কি না

শিশুর চোখ দিয়ে পুরো বাসাটি দেখুন

একটি বাসা বড়দের কাছে নিরাপদ মনে হলেও শিশুর জন্য একই জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই বাসা দেখার সময় একবার শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো জায়গাটি দেখার চেষ্টা করুন।

কোথায় শিশু পড়ে যেতে পারে, কোন জায়গায় উঠে যেতে পারে, কোথায় হাত দিলে বিপদ হতে পারে কিংবা কোন জায়গাগুলোতে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন এসব আগে থেকেই চিহ্নিত করুন।

নতুন বাসায় ওঠার পরও সতর্ক থাকুন

বাসা নেওয়ার আগে ঝুঁকি চিহ্নিত করাই শেষ কথা নয়। বাসায় ওঠার পরও শিশুর বয়স ও চলাফেরার অভ্যাস অনুযায়ী পরিবেশটি নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চলাফেরার পরিধিও বাড়ে। তাই আগে নিরাপদ মনে হওয়া কোনো জায়গা পরবর্তীতে তার নাগালের মধ্যে চলে আসতে পারে।

শেষ কথা

নতুন বাসা বাছাইয়ের সময় শুধু ভাড়া, লোকেশন বা সুযোগ-সুবিধা দেখলেই হবে না। পরিবারের ছোট সদস্যদের নিরাপত্তাও সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

বাসা পছন্দ করার আগে কয়েক মিনিট অতিরিক্ত সময় নিয়ে নিরাপত্তার বিষয়গুলো যাচাই করুন। কারণ একটি নিরাপদ বাসা শুধু থাকার জায়গা নয়, পরিবারের জন্য স্বস্তির জায়গাও।


শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন

নতুন বাসা নেওয়ার সময় শিশুর নিরাপত্তার জন্য প্রথমে কী দেখা উচিত?

প্রথমে বারান্দা, জানালা, সিঁড়ি, লিফট, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ এবং বাসার আশপাশের পরিবেশ যাচাই করা উচিত। শিশুর বয়স ও চলাফেরার ধরন অনুযায়ী কোন জায়গাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সেটিও বিবেচনা করুন।

বারান্দার ক্ষেত্রে কী কী বিষয় দেখা দরকার?

বারান্দার গ্রিল মজবুত কি না, গ্রিলের ফাঁক দিয়ে শিশু বেরিয়ে যেতে পারে কি না এবং শিশুকে সহজে বারান্দার কিনারায় পৌঁছে দিতে পারে এমন কোনো আসবাব আছে কি না এসব বিষয় দেখা প্রয়োজন।

বাসা নেওয়ার আগে ভবনের নিরাপত্তা সম্পর্কে কী জানা উচিত?

ভবনের প্রবেশপথ, সিঁড়ি, লিফট, ছাদে যাওয়ার ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাকর্মী বা সিসিটিভির মতো ব্যবস্থা থাকলে সেগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো। জরুরি প্রয়োজনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, সেটিও আগে থেকে জেনে রাখুন।

শিশুর নিরাপত্তার জন্য কি শুধু বাসার ভেতর দেখলেই হবে?

না। ভবনের আশপাশের রাস্তা, প্রবেশপথ, ছাদ এবং আশপাশের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাসা ও ভবনের পাশাপাশি পুরো পরিবেশটি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বাসা নেওয়ার পরও কি নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে?

হ্যাঁ। শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চলাফেরার পরিধিও বাড়ে। তাই বাসায় ওঠার পরও সময় সময় নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করা ভালো।

Comments